বিশ্ব

চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা, স্বজনদের অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না

Desk Reportকন্ট্রিবিউটর২১ অক্টোবর ২০২৬ · ৪ মিনিটের পড়াRead in English

উচ্চ বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতিতে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশি কর্মীদের একটি অংশের ক্ষেত্রে। কেউ আহত হয়ে দেশে ফিরেছেন, কেউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আবার অনেকের পরিবার মৃত্যুর খবর পেলেও আনুষ্ঠানিক প্রমাণ বা মরদেহ না পাওয়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

গত ৭ মে রাশিয়ায় যাওয়া ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। ১৪ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীটি জানায়, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে তাঁদের বিদেশে নেওয়া হলেও পরে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হয়।

তবে নিহত ও নিখোঁজ বাংলাদেশিদের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়। পরিবারের অভিযোগ ও দেশে ফেরা কর্মীদের বর্ণনার সঙ্গে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যেও পার্থক্য রয়েছে।

চাকরির বদলে সেনাক্যাম্পে নেওয়ার অভিযোগ

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপের মাধ্যমে ওই ৩০ জন রাশিয়ায় যান। প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত কাজে নিয়োগ না দিয়ে তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

এ ঘটনায় মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে ১৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়।

দেশে ফেরা ঝিনাইদহের রাজন হোসেনের ভাষ্য, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর কয়েক দিন হোটেলে রেখে একটি কাগজে সই নেওয়া হয়। এরপর তাঁকে সেনাক্যাম্পে পাঠানো হয়। প্রায় তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শেষে আরও পাঁচ বাংলাদেশির সঙ্গে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে যেতে হয় তাঁকে।

রাজনের দাবি, ড্রোন হামলায় তাঁদের দলের চারজন মারা যান। তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরে সেখান থেকে পালিয়ে দেশে ফেরেন।

নারায়ণগঞ্জের আদনান হোসেনও যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পেটে স্প্লিন্টারের আঘাত নিয়ে মস্কোর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তিনবার অস্ত্রোপচার হয়। প্রায় দুই মাস চিকিৎসার পর হাসপাতাল ছেড়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে যান। পরে ভ্রমণ অনুমতিপত্র নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন।

মৃত্যুর খবর আছে, নিশ্চিত প্রমাণ নেই

রাশিয়ায় যাওয়া লালমনিরহাটের আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিবারও তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়েছে। বাবা আবদুল মজিদের ভাষ্য, যুদ্ধে পাঠানোর আগে মামুন ছোট ভাইকে ফোন করে আর দেখা না হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছিলেন। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

পরে এক সহযাত্রীর মাধ্যমে মৃত্যুর খবর পেলেও পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে তা নিশ্চিত হতে পারেনি। ফলে মরদেহের অপেক্ষার পাশাপাশি ঋণের বোঝা ও সংসারের অনিশ্চয়তা সামলাতে হচ্ছে স্বজনদের।

অন্যদিকে মো. পলাশ শেখ নামে আরেক কর্মী যুদ্ধে আহত হয়ে মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। স্বজনদের অভিযোগ, চাকরির জন্য রাশিয়ায় গিয়ে প্রতারিত হয়েছেন তিনি। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা চেয়েছেন তাঁরা।

অনুমোদন ছাড়াই কর্মী পাঠানোর প্রশ্ন

রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইং থেকে ২৫ মে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

চিঠির তথ্য অনুযায়ী, জাবালে নূর ও আরএস ইন্টারন্যাশনালের কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দূতাবাসের সত্যায়ন না মেলায় অন্য এজেন্সির নামে কর্মী পাঠানো হয়। বিষয়টি যাচাইয়ের অনুরোধ জানায় দূতাবাস। একই সঙ্গে কর্মীদের যুদ্ধে না পাঠিয়ে নিয়োগপত্র অনুযায়ী কাজে ফিরিয়ে নিতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের কথাও জানানো হয়।

গত জুলাইয়ে স্বজনদের নিরাপদে ফেরানোর অনুরোধ জানিয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক আবেদন জমা দেওয়া হয়। এসব আবেদনে চাকরির প্রলোভনে নিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ করা হয়।

স্বেচ্ছায় যোগদানের দাবি, ভিন্ন বক্তব্য পরিবারের

রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশিরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে তাদের কাছে লিখিত নথি রয়েছে।

তবে দেশে ফেরা কর্মী ও স্বজনদের অভিযোগ, চাকরির কথা বলে নিয়ে তাঁদের যুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হলেও পরে তাঁদের সেনাক্যাম্পে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন ফেরত আসা কর্মীরা।

রাষ্ট্রদূত আরও জানিয়েছেন, রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ মরদেহ হস্তান্তর না করায় সেগুলো দেশে পাঠানো যাচ্ছে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া এখন পর্যন্ত নিহত ও নিখোঁজ মিলিয়ে ৪০ বাংলাদেশির তথ্য জানিয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে কতজন নিহত এবং কতজন নিখোঁজ, তা আলাদাভাবে স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে নিখোঁজ সবাইকে মৃত হিসেবে নিশ্চিত করার সুযোগ নেই।

মৃত্যুর নথি না থাকায় সহায়তা পেতেও বাধা

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে প্রবাসে মৃত কর্মীর মরদেহ দেশে আনা এবং পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক প্রমাণ না থাকায় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো আবেদন করতেও সমস্যায় পড়ছে।

রাশিয়ায় ক্ষতিপূরণ দাবি করার ক্ষেত্রেও উত্তরাধিকার নির্ধারণসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। মরদেহ ও প্রয়োজনীয় নথি না পাওয়ায় পরিবারগুলোর অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।

তিন এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল

ওই ৩০ কর্মীকে পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাবালে নূর, টিএস ওভারসিজ ও আরএস ইন্টারন্যাশনালের লাইসেন্স বাতিল করেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া বন্যা বিজয় ওভারসিজের নতুন বহির্গমন ছাড়পত্র নেওয়ার সুবিধা বন্ধ করা হয়েছে।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রাশিয়ায় যেতে ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৩৭ জন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১ হাজার ৩৯৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ হাজার ৭২৫ জন। চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ১০৫ জন। তবে এসব সংখ্যা বৈধভাবে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া ব্যক্তিদের; সবাই যুদ্ধে জড়িয়েছেন—এমন তথ্য নয়।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, চাকরির তথ্য যাচাই ও সত্যায়ন ছাড়া ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। বিকল্প পথে বিদেশে যাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে দূতাবাসগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ শনাক্ত ও ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির জন্য হটলাইন চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। রাশিয়ায় যাওয়া কর্মীদের কতজন চাকরি পেয়েছেন, কতজন যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে আছেন এবং কতজনের মৃত্যু হয়েছে—এসব তথ্য সমন্বিতভাবে সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন তিনি।

এ বিষয়ে আরও খবর