বিশ্ব
জ্ঞানেশের পদত্যাগ ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে ফের আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (এসআইআর) বাতিলের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনে বুধবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে দিল্লি। আইন অমান্য করে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র একাধিক নেতাকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
আটক নেতাদের মধ্যে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও রয়েছেন। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ব্যাপক তৎপরতা চালায়।
আটকের আগে রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, জ্ঞানেশ কুমার বৈধভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না। তাঁর ভাষায়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশ কুমারকে সরে যেতে হবে।
রাহুলের দাবি, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক নির্দেশনা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারকে সামনে রেখে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।
এর আগের দিন মঙ্গলবারও একই দাবিতে দিল্লিতে আন্দোলন করেন রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা। তারা পুলিশের নজর এড়িয়ে আকাশবাণী ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে সেখানে প্রায় নয় ঘণ্টা অবস্থান করেন। পরে পুলিশ তাদের আটক করলেও প্রায় দুই ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়।
গোপন পরিকল্পনায় যন্তর মন্তরের পথে
বুধবার ইন্ডিয়া জোটের নেতারা আগাম ঘোষণা ছাড়াই যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। দুপুরে কনট প্লেসের কাছে জনপথের একটি রেস্তোরাঁয় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বিরোধী নেতাদের মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন।
খাড়গে, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার পাশাপাশি সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ব্রায়ান ও মহুয়া মৈত্রসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সিপিএম, আরজেডি, এনসিপিসহ অন্যান্য দলের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন।
মধ্যাহ্নভোজের সময়ই যন্তর মন্তরে যাওয়ার কৌশল চূড়ান্ত করা হয়। পরে দুটি বাস সেখানে পৌঁছালে নেতারা তাতে উঠে বসেন। বাস দুটি জনপথ হয়ে মেরিডিয়েন হোটেলের দিকে এগিয়ে যায়। পুলিশ বাস দুটিকে থামানোর চেষ্টা করলেও শুরুতে সফল হয়নি।
পরে বাস অশোক রোডের দিকে ঢুকে পড়লে পুলিশ বাধা দেয়। একপর্যায়ে বাস থামিয়ে দেওয়া হয় এবং চাকার হাওয়াও ছেড়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঘটনাস্থলে কয়েকশ কংগ্রেস কর্মী জড়ো হন।
বাস থেকে নেমে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা দলীয় কর্মীদের সঙ্গে মিশে যন্তর মন্তরের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। কিছুদূর যাওয়ার পর পুলিশ তাদের আটক করে।
আটক ঠেকাতে রাস্তায় বসে পড়েন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা
আটকের সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একদিকে বিরোধী নেতাদের ‘ভোটচুরি’সহ বিভিন্ন স্লোগান, অন্যদিকে পুলিশি তৎপরতায় ঘটনাস্থলে ব্যাপক ভিড় তৈরি হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আটকের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে আটক এড়াতে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী একপর্যায়ে রাস্তায় শুয়ে পড়েন। রাহুলও রাস্তায় বসে পড়েন। পরে পুলিশ তাদের তুলে বাসে নিতে সক্ষম হয়।
সন্ধ্যার দিকে পুরো এলাকা নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভিড়ে পরিণত হয়।
আটকের আগে রাহুল গান্ধী বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে এরই মধ্যে বহু মামলা হয়েছে। আরও মামলা হলেও তিনি আন্দোলন থেকে সরে যাবেন না।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগ এবং এসআইআর বাতিল না হওয়া পর্যন্ত বিরোধীদের আন্দোলন চলবে।
আগামী দিনেও আন্দোলন চালানোর ঘোষণা
ইন্ডিয়া জোটের সূত্র জানিয়েছে, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
আগামী ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তর অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির নেতারা বলেছেন, সেদিন পুলিশ যেখানে আন্দোলনকারীদের আটক করবে, সেখানেই তারা প্রতিবাদ কর্মসূচিকে যন্তর মন্তরের প্রতীকী রূপ দেবেন।
এই কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে কয়েকটি বামপন্থী ছাত্রসংগঠনও।
বুধবার দিল্লি প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস বলেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ করলেও তাদের আন্দোলন শেষ হবে না। নির্বাচন কমিশনের কাঠামোগত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির সঙ্গে উপস্থিত ছিল সিপিএমের ছাত্রসংগঠন এসএফআই, সিপিআইয়ের এআইএসএফ, সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের এআইএসএ এবং আম আদমি পার্টির ছাত্রসংগঠন এএসএপি।
আইসার এক নেত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনে ছাত্রসংগঠন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সবাইকে একসঙ্গে আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ছত্তিশগড় সফর বাতিল জ্ঞানেশ কুমারের
এদিকে বিরোধীদের ব্যাপক আন্দোলনের মধ্যে ছত্তিশগড় সফর বাতিল করেছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।
বুধবার থেকে দুই দিনের সফরে কমিশনের অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর ছত্তিশগড় যাওয়ার কথা ছিল। তবে ‘অনিবার্য কারণে’ সফরটি স্থগিত করা হয়েছে বলে রাজ্যটির মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এর আগে বিরোধীদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর উত্তর প্রদেশের বেরিলি ও বারানসি সফর বাতিল করেন জ্ঞানেশ। পরে লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখন্ড সফরও বাতিল করা হয়।
কমিশন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দেশজুড়ে বিরোধীদের বিক্ষোভের মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার আপাতত জনসমক্ষে চলাফেরা এড়িয়ে যাচ্ছেন। গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কতার কারণেই তাঁকে দিল্লির বাইরে সফর না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।







