সাধারণ

শেরপুর সদর হাসপাতালে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ, ভোগান্তিতে রোগীরা

Arabia Tanzil Nishiকন্ট্রিবিউটর৩০ অক্টোবর ২০২৬ · ৫ মিনিটের পড়াRead in English

শেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, লিফট বিকল থাকা, প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও শয্যাসংকট, নার্সদের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ এবং জরুরি বিভাগে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার মতো নানা সমস্যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা।

জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চিকিৎসার আশায় এই হাসপাতালে আসেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সরকারি এই হাসপাতাল চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। কিন্তু হাসপাতালের বিভিন্ন সেবায় ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তাঁদের সেই ভরসাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

লিফট বিকল, বাড়ছে রোগীদের দুর্ভোগ

হাসপাতালের লিফট বিকল হয়ে পড়া এবং কয়েক দিন পরপর এ নিয়ে ভোগান্তি তৈরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক, গুরুতর অসুস্থ, অস্ত্রোপচার করা রোগী এবং চলাফেরায় অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য লিফট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লিফট সচল না থাকলে রোগীদের এক তলা থেকে অন্য তলায় নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে রোগীর স্বজনদের বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়। গুরুতর অসুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে এই ভোগান্তি আরও বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এ অবস্থায় হাসপাতালের লিফট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিকল হলে দ্রুত মেরামতের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা

হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল স্থানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অনেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল থাকেন। তাঁদের জন্য অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ওয়ার্ড, শৌচাগার, রোগীদের চলাচলের পথ এবং আশপাশের পরিবেশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন।

হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন কি না এবং এ বিষয়ে প্রশাসনিক তদারকি কতটা কার্যকর—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

চিকিৎসক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা

হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক কম থাকার অভিযোগও রয়েছে। রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা পর্যাপ্ত না হলে স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসাসেবা দিতে বিলম্ব হতে পারে। এতে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং চিকিৎসকদের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।

বিশেষ করে বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ সামলাতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেলে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।

তবে হাসপাতালের অনুমোদিত ও কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা, শূন্য পদ এবং রোগীর দৈনিক চাপের পরিসংখ্যান যাচাই করে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

শয্যাসংকটে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে রোগীদের

হাসপাতালে রোগীর তুলনায় শয্যাসংকটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে। শয্যা না পেয়ে কোনো কোনো রোগীকে মেঝেতে অবস্থান করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অসুস্থ অবস্থায় মেঝেতে থাকা রোগীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। এতে রোগীর বিশ্রাম, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি রোগীর স্বজনদেরও নানা ধরনের অসুবিধার মুখে পড়তে হয়।

হাসপাতালের প্রকৃত শয্যাসংখ্যা, প্রতিদিন ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, পরিষ্কার বিছানা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

নার্সদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ

চিকিৎসাসেবার মানের পাশাপাশি হাসপাতালের কর্মীদের আচরণও রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শেরপুর সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালনরত নার্সদের কারও কারও বিরুদ্ধে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগ উঠেছে।

রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা অসুস্থতা, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার করেন। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের সহানুভূতিশীল আচরণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান তাঁদের মানসিক স্বস্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রোগী ও স্বজনদের বক্তব্য এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতামত নিয়ে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

দালাল ও মোবাইল চুরির অভিযোগ, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

হাসপাতাল এলাকায় দালালের দৌরাত্ম্য এবং মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। চিকিৎসার জন্য আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা সাধারণত ব্যস্ততা ও মানসিক চাপে থাকেন। এ সুযোগে কেউ প্রতারণা বা চুরির শিকার হলে তাঁদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।

হাসপাতাল এলাকায় দালালদের তৎপরতা থাকলে রোগীদের সঠিক সেবা গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে চুরির ঘটনা ঘটলে রোগী ও স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে হাসপাতাল এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা এবং অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। দালালচক্রের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

জরুরি বিভাগে সেবা নিয়ে অসন্তোষ

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা পাওয়া রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনা, হঠাৎ অসুস্থতা কিংবা গুরুতর শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা দ্রুত চিকিৎসার আশায় জরুরি বিভাগে আসেন।

কিন্তু শেরপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রয়োজনীয় সেবা সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। রোগীদের অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ জরুরি চিকিৎসায় বিলম্ব হলে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে।

জরুরি বিভাগে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল, রোগী মূল্যায়ন, প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

ময়মনসিংহে রেফার্ড: চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

শেরপুর সদর হাসপাতাল থেকে রোগীদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করার বিষয়টি নিয়েও রোগী ও স্বজনদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কোনো হাসপাতালে রোগীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠানো স্বাভাবিক ও অনেক ক্ষেত্রে জরুরি। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞসেবা স্থানীয় পর্যায়ে পাওয়া সম্ভব হওয়া সত্ত্বেও যদি রোগীদের নিয়মিত অন্যত্র পাঠানো হয়, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

রোগীদের অভিযোগ, রেফার করার কারণে তাঁদের যাতায়াত, চিকিৎসার খরচ ও সময়ের চাপ বাড়ে। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার সময় স্বজনদের বাড়তি উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

তবে ময়মনসিংহে রেফার করার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে কি না, তা প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এ বিষয়ে রেফারের পরিসংখ্যান, রোগীর অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা এবং হাসপাতালের চিকিৎসা সক্ষমতা যাচাই করে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করা জরুরি।

প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

হাসপাতালের বিভিন্ন সেবা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় প্রশাসনিক তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসক ও নার্সদের দায়িত্ব পালন, লিফটের রক্ষণাবেক্ষণ, শয্যাসংকট, নিরাপত্তা এবং জরুরি বিভাগের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

এসব ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকি না থাকলে রোগীদের দুর্ভোগ কমানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে সমস্যার স্থায়ী সমাধানে হাসপাতাল প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

শেরপুর সদর হাসপাতাল জেলার সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান উন্নত করা গেলে জেলার অসংখ্য মানুষ উপকৃত হবেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র যাওয়ার চাপও কমতে পারে।

এ জন্য হাসপাতালের লিফট সচল রাখা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ, পর্যাপ্ত শয্যার ব্যবস্থা, নার্স ও কর্মীদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা এবং দালাল ও চুরির অভিযোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে জরুরি বিভাগে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং রোগীদের অন্য হাসপাতালে রেফার করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

জনগণের অর্থে পরিচালিত সরকারি হাসপাতাল থেকে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাওয়া মানুষের অধিকার। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং দৃশ্যমান উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে শেরপুর সদর হাসপাতালের সেবার মান উন্নত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

এ বিষয়ে আরও খবর