প্রযুক্তি

​অ্যাপলের সোনেরা অধিগ্রহণ: প্রযুক্তির নতুন দিগন্তে বাংলাদেশি গবেষক ড. সায়েফ সালাহউদ্দিন

Takebul Hasan Seyamকন্ট্রিবিউটর২১ অক্টোবর ২০২৬ · ২ মিনিটের পড়াRead in English

তৌকিবুল হাসান সিয়াম, জাবি প্রতিনিধি তারিখ: ২১অক্টোবর ২০২৬

​মানব মস্তিষ্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও সংকেত শনাক্ত করতে পারদর্শী নন-ইনভেসিভ (শরীরে কোনো যন্ত্র প্রবেশ না করিয়ে) সেন্সর প্রযুক্তি উদ্ভাবনকারী স্টার্টআপ সোনেরা কিনে নিয়েছে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল। চলতি বছরের শুরুতে এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এর অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। তবে অ্যাপল বা সোনেরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অধিগ্রহণের বিষয়ে কিছু জানায়নি।

​সোনেরার সহপ্রতিষ্ঠাতা তিনজনের মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক ড. সায়েফ সালাহউদ্দিন। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। চৌম্বকীয় সেন্সর নিয়ে তাঁর গবেষণার সঙ্গে সোনেরার প্রযুক্তির যোগাযোগ রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল আর্লি ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ড ফর সায়েন্টিস্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’ সম্মাননা দেন, যা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মাননা স্মারক। ​২০১৮ সালে নিশিতা ডেকা ও ডমিনিক লাবানোস্কি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলিতে শিক্ষার্থী থাকাকালে স্টার্টআপটি প্রতিষ্ঠা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টির অধ্যাপক সায়েফ সালাহউদ্দিন ছিলেন লাবানোস্কির পিএইচডি গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক এবং তিনজন মিলে এই গবেষণা সংস্থাটি গড়ে তোলেন। শুরুতে এর নাম ছিল ‘সোনেরা ম্যাগনেটিকস’। প্রথম ধাপে ২০২৩ সালে স্টার্টআপটি এক কোটি ১০ লাখ ডলারের অনুদান পায় এবং তাদের প্রথম উদ্ভাবন ছিল পেশির নড়াচড়া শনাক্ত করার জন্য তৈরি বিশেষ চিপ ‘এসওয়ান’। উদ্ভাবকদের দাবি, এই প্রযুক্তি মানব মস্তিষ্কের চৌম্বকীয় নড়াচড়া নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে।

​সাধারণত বৈদ্যুতিক সংকেত মাথার খুলির ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকাংশে দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু এই প্রযুক্তি কৌশলে বৈদ্যুতিক সংকেতের বদলে চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করে। সহপ্রতিষ্ঠাতা নিশিতা ডেকা জানিয়েছিলেন, তাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল মস্তিষ্কের ছবি ধারণের প্রযুক্তিকে সহজ বহনযোগ্য ও সাশ্রয়ী করা এবং মস্তিষ্কের সক্রিয় কয়েক ধরনের সংকেত সরাসরি শনাক্ত করা। কৃত্রিম পদ্ধতিতে অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ও মানবিক ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি পরিধানযোগ্য ডিভাইসের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর হবে।

​অ্যাপল ইনসাইডার রিপোর্ট অনুযায়ী, ভবিষ্যতের অ্যাপল ঘড়ি ছাড়াও মানব শরীরে পরিধানযোগ্য অন্যান্য ডিভাইসেও এই চিপ ব্যবহৃত হতে পারে। সোনেরা যা করতে পারে তা হলো ব্রেইন, নার্ভ ও পেশির প্রকৃত ভাষা শনাক্ত করা। ফলে ভবিষ্যতে কথা না বলে শুধু চোয়ালের পেশির নড়াচড়ার মাধ্যমে অ্যাপল ভিশন প্রো-এর মতো ডিভাইসকে কমান্ড দেওয়া যাবে। এছাড়া শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা, বিশেষ করে যাঁদের হাত নেই, তারা শুধু চিন্তার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম হাত নড়াচড়া করতে পারবেন। স্নায়ু ও পেশিজনিত সমস্যার নিয়মিত পর্যবেক্ষণেও এ ধরনের সেন্সর দারুণ সহায়ক হবে।

​অ্যাপল কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণের তথ্যটি আগেভাগে প্রকাশ করতে না চাইলেও, দুই কোটি ডলারের এই ছোট্ট হেলথকেয়ার স্টার্টআপটিকে হাতছাড়া করতে চায়নি। কারণ তাদের কাছে অর্থের চেয়ে আগამის ধারণাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় ‘ব্রেইন ড্রেন’ বা মেধা পাচারের কথা শোনা গেলেও, ড. সায়েফ সালাহউদ্দিনের মতো গবেষকরা প্রমাণ করেন যে ব্রেইন কখনও ড্রেন হয় না; বরং তা সারাবিশ্বের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়ে। বুয়েটের ক্লাসরুম থেকে বার্কলের ল্যাব এবং সেখান থেকে অ্যাপলের বোর্ডরুম—এই ১২ হাজার মাইলের দূরত্ব প্রমাণ করে যে বিশ্বাস, নিষ্ঠা আর সম্ভাবনার দূরত্ব বলতে আদতে কিছু নেই।

এ বিষয়ে আরও খবর