প্রযুক্তি
প্রথম পারমাণবিক বিক্রিয়ার অনুমোদন পেল রূপপুর, বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে আরও অপেক্ষা

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ অতিক্রম করল প্রকল্পটি। তবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে আরও কয়েকটি কারিগরি পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য ‘বি-২’ পর্যায়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে ইউনিটটিতে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু করার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। প্রযুক্তিগতভাবে এ প্রক্রিয়াকে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বলা হয়।
বায়েরা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও দুটি পর্যায়ের অনুমোদন নিতে হবে। এগুলো হলো ‘সি’ ও ‘ডি’ পর্যায়ের অনুমোদন। প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত নিরাপত্তা মানদণ্ড ও কারিগরি পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলেই পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হবে।
কারিগরি জটিলতা কাটিয়ে অগ্রগতি
রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন পেতে বিলম্বের অন্যতম কারণ ছিল স্বয়ংক্রিয় চাপ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ভালভের কারিগরি ত্রুটি। এসব ভালভ পারমাণবিক চুল্লির নিরাপদ পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যা সমাধানে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের একটি দল প্রকল্প এলাকায় কাজ করে। প্রয়োজনীয় কারিগরি সংশোধন ও একাধিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ পরবর্তী পর্যায়ের অনুমোদন দেয়।
যেভাবে শুরু হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন
প্রথম ক্রিটিক্যালিটি পর্যায়ে পারমাণবিক চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে চুল্লিটি তার পূর্ণ তাপীয় সক্ষমতার ১ শতাংশের কম মাত্রায় পরিচালিত হবে।
এ সময় প্রকৌশলীরা চুল্লির তাপমাত্রা, চাপ, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন সূচক পর্যবেক্ষণ করবেন। পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে চুল্লির তাপীয় ক্ষমতা বাড়ানো হবে।
পরবর্তী পর্যায়ে পারমাণবিক বিভাজন থেকে উৎপন্ন তাপ ব্যবহার করে বাষ্প তৈরি করা হবে। সেই বাষ্পের সাহায্যে টারবাইন ও জেনারেটর পরিচালনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় ৬ থেকে ১০ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে এটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নয়।
ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের আশা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, সব পরীক্ষা ও অনুমোদন যথাসময়ে সম্পন্ন হলে আগামী ডিসেম্বরের শেষ দিকে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হবে।
তবে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়া এবং পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক উৎপাদন চালু হওয়া এক বিষয় নয়। নিরাপত্তা যাচাই ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের কারণে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যেতে আরও সময় লাগতে পারে।
দেশের জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প। রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় নির্মিত কেন্দ্রটিতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট রয়েছে। উভয় ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির নির্মাণকাজে যুক্ত রয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।
প্রথম ইউনিটে চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় নতুন একটি উৎস যুক্ত হবে। তবে প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে অবশিষ্ট কারিগরি পরীক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর।







