সাধারণ
উন্নয়ন বনাম পরিবেশ: মিরসরাইয়ের বনাঞ্চল ও হারিয়ে যাওয়া চিত্রা হরিণ

উন্নয়ন আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল করে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য যদি দিতে হয় অবলা বন্যপ্রাণী আর আমাদের সবুজ প্রকৃতিকে, তবে সেই ক্ষত কখনো পূরণ হওয়ার নয়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আমাদের অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন কোনো বনাঞ্চলের পরিবেশ ধ্বংস করে অর্জিত না হয়। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দেশের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কাজ যখন শুরু হয়, তখন এর এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়ে স্থানীয় পরিবেশের ওপর। শিল্পাঞ্চলের স্থান সংকুলানের জন্য এখানকার বিশাল এলাকা জুড়ে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি গাছ কেটে ফেলা হয়। ফলে এক ধাক্কায় ধ্বংস হয়ে যায় উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সাম্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। একসময় মিরসরাইয়ের এই বিস্তৃত উপকূলীয় বনে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার চিত্রা হরিণ স্বাচ্ছন্দ্যে বাস করত। তবে পরিবেশবিদ ও বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নির্বিচার বন ধ্বংস এবং লাগাতার নির্মাণ কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট উপদ্রবে এই অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ চিত্রা হরিণই হারিয়ে গিয়েছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারী এই সুন্দর প্রাণীগুলো আজ নিজ আবাসেই পরবাসী। আবাসস্থল হারিয়ে যে অল্প কিছু হরিণ এখনো বেঁচে আছে, তাদের দিন কাটছে চরম অনিশ্চয়তা ও অরক্ষিত অবস্থায়। খাদ্যের খোঁজে বা নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় তারা প্রায়শই লোকালয়ে কিংবা মূল রাস্তায় চলে আসছে। ফলে একদিকে যেমন যানবাহনের দ্রতগতির আঘাতে প্রাণ হারাচ্ছে, অন্যদিকে পড়ে যাচ্ছে নিষ্ঠুর শিকারিদের খপ্পরে। এমনকি ২০২৬ সালের এপ্রিলে মিরসরাইয়ের মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় একটি হরিণ ধরে জবাই করার নির্মম ঘটনা ঘটে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই অবলা প্রাণীগুলো কতটা অসহায়। তাই শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিকল্পিত বনায়ন এবং হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট নিরাপদ করিডোর বা অভয়ারণ্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। টেকসই উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সঠিক উদ্যোগ যদি এখনই নেওয়া না হয়, তবে অচিরেই মিরসরাইয়ের বুক থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই মায়াবী চিত্রা হরিণগুলো।







