সাধারণ
মধুমতির ভাঙনে বিলীনের পথে চর মধুপুর, শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর শঙ্কা

নদীই ছিল জীবনের ভরসা, সেই নদীই এখন কেড়ে নিচ্ছে বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। মধুমতি নদীর অব্যাহত ভাঙনে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানার পহরডাঙ্গা ইউনিয়নের চর মধুপুরে দেখা দিয়েছে জনবসতি হারানোর শঙ্কা। একসময় যে গ্রামে ছিল ঘরবাড়ি, গাছপালা আর ফসলের মাঠ, সেখানে এখন নদীতীরজুড়ে অনিশ্চয়তা। ভাঙনের কবলে বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। যারা এখনো নিজেদের ভিটায় টিকে আছেন, তাঁদের ভয় যেকোনো সময় নদী কেড়ে নিতে পারে শেষ আশ্রয়টুকুও।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চর মধুপুরে নদীভাঙন নতুন নয়; দীর্ঘদিন ধরেই মধুমতি ধীরে ধীরে জনপদের জমি গ্রাস করছে। সময়ের সঙ্গে ভাঙনের ক্ষত বাড়লেও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের উদ্বেগ কাটছে না। ইতোমধ্যে অনেকে বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কেউ ঘরবাড়ি সরিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ পৈতৃক জমির শেষ অংশটুকু আঁকড়ে ধরে আছেন। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অবশিষ্ট বাড়িঘরও রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর তীরবর্তী কয়েকটি বাড়ি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কোথাও কোথাও স্রোত এসে ঠেকেছে বসতভিটার কাছাকাছি। নদীপাড়ের পরিবারগুলোর কাছে দিন-রাতের হিসাবও যেন আলাদা দিনে চোখের সামনে ভাঙন দেখা যায়, আর রাতে বাড়ে অজানা আশঙ্কা। কখন পাড় ধসে ঘরবাড়ি নদীতে তলিয়ে যাবে, সেই দুশ্চিন্তায় স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে অনেকের।
নিজের পৈতৃক ভিটা হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে মিজান মল্লিকের। তিনি বলেন, “সব হারিয়ে এখন শুধু পৈতৃক ভিটাটুকু আছে। সেটিও কখন নদীগর্ভে চলে যায়, সেই আতঙ্কে রাতদিন ঘুমাতে পারি না। আশপাশে আর বাড়ি নেই। এখন আমার বাড়িটিও কখন হারিয়ে যায়, সেই চিন্তায় আছি।” স্থানীয় বাসিন্দা আলহাজ্ব মল্লিকও দীর্ঘদিনের ভাঙনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “জন্ম থেকেই এই ভাঙন দেখে আসছি। বছরের পর বছর নদীভাঙনে আমরা পরিবার নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছি।”
চর মধুপুরের মানুষের উদ্বেগ এখন শুধু জমির সীমানা ছোট হয়ে আসা নয়; তাঁদের সামনে প্রশ্ন- বসতভিটা হারালে পরিবার নিয়ে কোথায় যাবেন, কীভাবে টিকিয়ে রাখবেন জীবিকা? নদীভাঙনে ঘরবাড়ির পাশাপাশি ফসলি জমি হারালে অর্থনৈতিক সংকটও বাড়ে। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী, পরিচিত পরিবেশ আর পূর্বপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত ঠিকানা ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্টও তাঁদের জন্য কম নয়। স্থানীয়দের মতে, ক্ষতি হওয়ার পর ত্রাণ বা সহায়তার কথা ভাবার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর আগেভাগে শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
১০ নম্বর পহরডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মল্লিক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, “চর মধুপুরে নদীভাঙনের প্রকোপ অনেক বেড়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। ইতোমধ্যে কালিয়া উপজেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে।” তাঁর বক্তব্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিন্নাতুল ইসলাম বলেন, “চর মধুপুরের নদীভাঙনের বিষয়টি ইতোমধ্যে অবগত হয়েছি। দ্রুত যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য জানানো হয়েছে।” প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার কথা জানানো হলেও নদীপাড়ের বাসিন্দারা এখন দ্রুত কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে তিনি রয়েছেন। তিনি বলেন, “চর মধুপুর গ্রামের নদীভাঙনকবলিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশার বিষয়টি আমি জেনেছি। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের পাশে অতীতেও ছিলাম, এখনো আছি এবং থাকব, ইনশাআল্লাহ।”
চর মধুপুরের বাসিন্দারা জরুরি ভিত্তিতে নদীতীরের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের প্রস্তাব, পরিস্থিতি বিবেচনায় জিওব্যাগ ব্যবহারসহ উপযুক্ত প্রকৌশলগত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং শুধু সাময়িক সুরক্ষা নয়, দীর্ঘমেয়াদি নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পও বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব পরিবার ইতোমধ্যে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের পুনর্বাসন ও জরুরি সহায়তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
নদীভাঙনে একটি বাড়ি হারানোর অর্থ শুধু ইট, কাঠ কিংবা টিনের ঘর হারানো নয়; হারিয়ে যায় একটি পরিবারের নিরাপত্তা, জীবিকার ভিত্তি এবং বহু বছরের স্মৃতি। চর মধুপুরের বাসিন্দাদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তাঁদের অবশিষ্ট জনপদ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা কত দ্রুত নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের সমন্বিত, সময়োপযোগী এবং টেকসই উদ্যোগই পারে মধুমতির ভাঙন থেকে গ্রামটিকে রক্ষার সম্ভাবনা তৈরি করতে। নদীপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা, তাঁদের শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে যাওয়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।







