বিজ্ঞান
জগদীশচন্দ্র বসু: বেতার তরঙ্গ থেকে উদ্ভিদের প্রাণস্পন্দন, এক বিজ্ঞানীর অসীম অনুসন্ধানের গল্প

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার বিজ্ঞান-ইতিহাসের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। পদার্থবিজ্ঞান, বেতার ও মাইক্রোওয়েভ গবেষণা, উদ্ভিদ-শারীরবিদ্যা এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্র উদ্ভাবন, একাধিক ক্ষেত্রে তাঁর কাজ তাঁকে তাঁর সময়ের সীমানা অতিক্রমকারী এক পরীক্ষণধর্মী বিজ্ঞানীতে পরিণত করেছিল। তাঁর জন্ম ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ময়মনসিংহে, বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে; মৃত্যু ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর ভারতের গিরিডিতে। রয়্যাল সোসাইটির নথিতেও তাঁর জন্মস্থান Mymensingh, Bangladesh হিসেবে উল্লেখ আছে।
তবে তাঁকে শুধু "রেডিওর আবিষ্কারক" বলা যেমন অতিসরলীকরণ, তেমনি তাঁর উদ্ভিদ-গবেষণাকে বিচ্ছিন্ন কোনো অধ্যায় হিসেবে দেখাও তাঁর বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকারকে অসম্পূর্ণ করে। বসুর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি প্রকৃতির বিভিন্ন ঘটনাকে আলাদা আলাদা বাক্সে বন্দি করে দেখতেন না। পদার্থ, জীবদেহ ও উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে কোনো মৌলিক যোগসূত্র আছে কি না, সেই প্রশ্ন তাঁকে ক্রমাগত নতুন গবেষণার দিকে নিয়ে যায়।
শৈশব ও শিক্ষার ভিত
জগদীশচন্দ্র বসুর পিতা ভগবানচন্দ্র বসু ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে যুক্ত একজন প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। পিতার সিদ্ধান্তেই জগদীশচন্দ্রের প্রাথমিক শিক্ষা ইংরেজি মাধ্যমের অভিজাত প্রতিষ্ঠানে নয়, বাংলা ভাষার বিদ্যালয়ে শুরু হয়। পরবর্তীকালে বসু নিজেই স্মরণ করেছিলেন, সেই বিদ্যালয়ে তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণির পরিবারের সন্তান। এই অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তার জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
পরবর্তীতে তিনি কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখানে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফাদার ইউজিন লাফোঁর প্রভাব তাঁর বৈজ্ঞানিক আগ্রহকে আরও গভীর করে। তিনি ১৮৭৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ইংল্যান্ডে গিয়ে প্রথমে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার চেষ্টা করলেও অসুস্থতার কারণে সেই পথ ত্যাগ করেন। পরে কেমব্রিজের ক্রাইস্টস কলেজে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন এবং ১৮৮৪ সালে কেমব্রিজ থেকে Natural Sciences Tripos-এ BA লাভ করেন। একই সময়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে BSc-ও অর্জন করেন।
এই শিক্ষাজীবন তাঁকে শুধু ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করেনি, বরং পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ এবং প্রমাণনির্ভর অনুসন্ধানের একটি শক্ত ভিত তৈরি করে দিয়েছিল।
প্রেসিডেন্সি কলেজে বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিজ্ঞান
ইংল্যান্ড থেকে ফিরে বসু কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ঔপনিবেশিক ভারতে একজন ভারতীয় অধ্যাপক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন সহজ ছিল না। তাঁকে ব্রিটিশ সহকর্মীদের তুলনায় কম বেতন দেওয়ার বৈষম্য এবং গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ও ল্যাবরেটরি সুবিধার অভাবের মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবুও তিনি গবেষণা থামাননি।
এই সময়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর এমন কিছু পরীক্ষা, যা পরবর্তীকালে বেতার যোগাযোগ ও মাইক্রোওয়েভ বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষ স্থান পায়।
মাইক্রোওয়েভ নিয়ে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা
উনিশ শতকের শেষ দশকে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছিল। হাইনরিখ হার্টজ পরীক্ষার মাধ্যমে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। বসু এই জ্ঞানকে আরও ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অঞ্চলে নিয়ে যান।
১৮৯৪ থেকে ১৮৯৯ সালের মধ্যে তাঁর গবেষণার প্রধান বিষয় ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ, যা আজকের ভাষায় মাইক্রোওয়েভ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। Bose Institute-এর ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত ছোট তরঙ্গ তৈরি ও পরীক্ষা করেছিলেন এবং সেগুলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ, মেরুকরণ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করেন।
১৮৯৫ সালে কলকাতায় তিনি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের বেতার প্রেরণ ও গ্রহণের একটি উল্লেখযোগ্য প্রদর্শন করেন। IEEE-এর ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, তিনি প্রায় ৬০ GHz ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ প্রায় ২৩ মিটার দূরত্বে, মাঝখানে দুটি দেয়াল থাকা সত্ত্বেও, প্রেরণ ও গ্রহণ করে দেখান। একটি ঘণ্টা বাজানো এবং গানপাউডার বিস্ফোরণের মাধ্যমে সংকেত গ্রহণের বিষয়টি প্রদর্শন করা হয়েছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সতর্কতা প্রয়োজন। জগদীশচন্দ্র বসুকে সরাসরি "রেডিও আবিষ্কারক" বলা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে। বেতার যোগাযোগের বিকাশে হার্টজ, লজ, পপভ, মার্কোনি এবং আরও অনেক বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর অবদান ছিল। বসুর বিশেষ অবদান ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ তৈরি, নিয়ন্ত্রণ, প্রেরণ ও শনাক্ত করার পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির উন্নয়ন। Physics Today-ও তাঁর ১৮৯৫ সালের মাইক্রোওয়েভ বেতার প্রদর্শনকে মার্কোনির পরবর্তী বেতার টেলিগ্রাফির প্রদর্শনের আগে সংঘটিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অ্যান্টেনা, ওয়েভগাইড ও সেমিকন্ডাক্টর ডিটেক্টর
বসুর গবেষণার আরেকটি অসাধারণ দিক ছিল তিনি শুধু তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেননি। নিজের পরীক্ষার প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি নিজেই অত্যন্ত সূক্ষ্ম যন্ত্র তৈরি করতেন।
তাঁর গবেষণায় ব্যবহৃত যন্ত্রগুলোর মধ্যে ছিল horn antenna, waveguide, polarizer, dielectric lens এবং বিভিন্ন ধরনের detector। Bose Institute-এর ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁর তৈরি waveguide ও horn antenna-কে আধুনিক microwave engineering-এর প্রাথমিক পূর্বসূরি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর detector গবেষণাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গ্যালেনা বা galena-ভিত্তিক point-contact detector নিয়ে তাঁর কাজ পরবর্তীকালের semiconductor detector প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত। তিনি ১৯০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে electrical disturbance detector-এর একটি পেটেন্ট লাভ করেন।
তবে তাঁর চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই প্রকাশ পায়। তিনি সাধারণভাবে নিজের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করার বিষয়ে অনাগ্রহী ছিলেন। বিজ্ঞানকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি না বানিয়ে জ্ঞানকে উন্মুক্ত রাখার প্রবণতা তাঁর মধ্যে প্রবল ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি পেটেন্ট গ্রহণ করলেও এটিকে তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবনের মূল লক্ষ্য বানাননি।
কেন তিনি বেতার গবেষণা ছেড়ে উদ্ভিদের দিকে গেলেন?
বসুর জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মোড়গুলোর একটি হলো তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র পরিবর্তন।
প্রথম পর্যায়ে তিনি পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষামূলক গবেষণায় নিমগ্ন ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর আগ্রহ চলে যায় একটি আরও মৌলিক প্রশ্নের দিকে:
জীবিত ও জড় পদার্থের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে কি কোনো মৌলিক সাদৃশ্য রয়েছে?
ধাতব পদার্থ, বৈদ্যুতিক detector এবং জীবন্ত টিস্যুর প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনায় তাদের প্রতিক্রিয়ার কিছু পরিমাপযোগ্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। ১৮৯৯ থেকে ১৯০২ সালের গবেষণা পর্যায়ে এই প্রশ্ন তাঁকে পদার্থবিজ্ঞান থেকে জীবপদার্থবিদ্যা ও উদ্ভিদ-শারীরবিদ্যার দিকে নিয়ে যায়।
প্রায় ১৯০১ সালের পর উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া তাঁর গবেষণার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
উদ্ভিদও কি প্রতিক্রিয়া জানায়?
আজ আমরা জানি উদ্ভিদ আলো, তাপমাত্রা, স্পর্শ, রাসায়নিক পদার্থ, বৈদ্যুতিক সংকেত এবং অন্যান্য পরিবেশগত উদ্দীপনার প্রতি জটিল প্রতিক্রিয়া দেখায়। কিন্তু বসুর সময় উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া নিয়ে এমন পরিমাণে সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক পরিমাপের ব্যবস্থা ছিল না।
বসু এই সীমাবদ্ধতা মেনে নেননি।
তিনি এমন যন্ত্র তৈরি করলেন যার মাধ্যমে উদ্ভিদের অত্যন্ত ক্ষুদ্র বৃদ্ধি ও নড়াচড়া পরিমাপ করা সম্ভব হয়। এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ Crescograph।
Crescograph-এর সাহায্যে উদ্ভিদের বৃদ্ধিকে বহুগুণ বড় করে রেকর্ড করা যেত। এর মাধ্যমে বিভিন্ন বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রভাবে উদ্ভিদের বৃদ্ধির হার ও প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছিল।
এই যন্ত্রের গুরুত্ব শুধু একটি নতুন বৈজ্ঞানিক যন্ত্র আবিষ্কারে সীমাবদ্ধ ছিল না। বসু উদ্ভিদকে এমন একটি পরীক্ষণযোগ্য জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছিলেন, যার শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনকে পরিমাপ, রেকর্ড ও বিশ্লেষণ করা যায়।
উদ্ভিদের বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়া
বসুর পরবর্তী গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল উদ্ভিদের electrical response বা বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়া।
তিনি বিভিন্ন উদ্দীপনার পর উদ্ভিদের টিস্যুতে বৈদ্যুতিক ও শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন পরিমাপ করার চেষ্টা করেন। এই কাজ তাঁকে উদ্ভিদ-ইলেক্ট্রোফিজিওলজির অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। রয়্যাল সোসাইটির নথিতেও তাঁর গবেষণাক্ষেত্রের মধ্যে physics-এর পাশাপাশি comparative physiology উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর গবেষণার বিশেষত্ব ছিল তিনি উদ্ভিদের "অনুভূতি" সম্পর্কে কেবল দার্শনিক বা কাব্যিক বক্তব্য দেননি। তিনি পরিমাপযোগ্য সংকেত ও পরীক্ষণযোগ্য প্রতিক্রিয়া খুঁজেছেন।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বসু উদ্ভিদকে মানুষ বা প্রাণীর মতো সচেতন সত্তা প্রমাণ করেননি। বরং তিনি দেখিয়েছিলেন যে উদ্ভিদ বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রতি পরিমাপযোগ্য শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। আধুনিক উদ্ভিদ-শারীরবিদ্যা ও plant signaling-এর আলোচনায় এই দৃষ্টিভঙ্গির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।
"জীবন" ও "জড়" পদার্থের সীমারেখা
বসুর গবেষণার একটি দার্শনিক মাত্রাও ছিল।
তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, জীবিত ও জড় পদার্থের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে কি সম্পূর্ণ অমোচনীয় সীমারেখা আছে?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি ধাতু ও জীবন্ত টিস্যুর প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষা করেন। উদ্দীপনা, ক্লান্তি, পুনরুদ্ধার এবং রাসায়নিক প্রভাবের মতো বিষয় নিয়ে তাঁর পরীক্ষাগুলো তাঁকে একটি বৃহত্তর ধারণার দিকে নিয়ে যায়।
তাঁর এই ব্যাখ্যার কিছু অংশ তাঁর সময়েও বিতর্কিত ছিল এবং আধুনিক জীববিজ্ঞানের আলোকে তাঁর সব সাধারণীকরণ গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু তাঁর গবেষণার ঐতিহাসিক মূল্য এখানেই যে তিনি পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের মধ্যে একটি পরীক্ষামূলক সেতু নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন।
এই আন্তঃবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যান্য বিজ্ঞানীদের থেকে আলাদা করে।
বিজ্ঞানকে বাণিজ্যের বাইরে রাখার আদর্শ
জগদীশচন্দ্র বসুর ব্যক্তিত্বের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি নিজের গবেষণাকে ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। এর ফলে তাঁর কিছু আবিষ্কারের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অন্যরা কাজে লাগালেও তিনি নিজে সেই প্রতিযোগিতায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেননি। তাঁর ১৯০৪ সালের পেটেন্ট ছিল ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা।
আজকের গবেষণা-জগতের patent, startup, technology transfer এবং intellectual property-এর যুগে বসুর এই অবস্থানকে একদিকে আদর্শবাদী, অন্যদিকে বাস্তব অর্থনীতির বিচারে জটিল বলে দেখা যায়।
তবে তাঁর একটি মৌলিক বিশ্বাস স্পষ্ট ছিল: বিজ্ঞান কেবল ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, মানবজাতির জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার জন্য।
বোস ইনস্টিটিউট: গবেষণার জন্য একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান
১৯১৭ সালে কলকাতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Bose Institute। এটি ছিল তাঁর বৈজ্ঞানিক স্বপ্নের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন শাখার বিজ্ঞানকে একত্র করে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা।
বোস ইনস্টিটিউটের ইতিহাসে পদার্থবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীবপদার্থবিদ্যার মতো বিভিন্ন শাখার আন্তঃসম্পর্কিত গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বসুর নিজের বৈজ্ঞানিক জীবনও ছিল আন্তঃবিষয়ক। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা থেকে উদ্ভিদ-শারীরবিদ্যায় গিয়েছিলেন, কিন্তু দুই ক্ষেত্রের মধ্যে তাঁর পরীক্ষণধর্মী পদ্ধতির ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
জগদীশচন্দ্র বসুর গবেষণা তাঁর জীবদ্দশাতেই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তাঁর কাজের প্রতি লর্ড কেলভিন, লর্ড র্যালি এবং অন্যান্য বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর আগ্রহ ও সমর্থনের কথা ঐতিহাসিক নথিতে পাওয়া যায়।
১৯১৭ সালে তাঁকে ব্রিটিশ সরকার Knight Bachelor উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯২০ সালে তিনি Fellow of the Royal Society (FRS) নির্বাচিত হন। রয়্যাল সোসাইটির নথি অনুযায়ী, তাঁর নির্বাচনের তারিখ ছিল ১৩ মে ১৯২০ এবং তাঁর গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে physics ও comparative physiology উল্লেখ করা হয়েছে।
এই স্বীকৃতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। ঔপনিবেশিক ভারতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সীমিত অবকাঠামোর মধ্যে থেকে একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ মর্যাদাগুলোর একটি অর্জন করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সম্পর্ক
বসুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধুত্ব ছিল বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বিজ্ঞান ও সাহিত্য, দুটি ভিন্ন জগতের মানুষ হয়েও তাঁদের মধ্যে গভীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছিল।
রবীন্দ্রনাথ বসুর বৈজ্ঞানিক সাফল্যে গর্ব অনুভব করতেন এবং তাঁর গবেষণাকে উৎসাহিত করতেন। বসুর বৈজ্ঞানিক সাফল্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রশংসার কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। Bose Institute-ও রবীন্দ্রনাথের বসুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার কথা উল্লেখ করেছে।
এই সম্পর্কের সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও কম নয়। এটি দেখায়, উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে বাংলার নবজাগরণের পরিমণ্ডলে বিজ্ঞান ও সাহিত্য পরস্পরবিচ্ছিন্ন দুটি জগত ছিল না।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচিন্তার একজন অগ্রদূত
বসুর গুরুত্ব শুধু তাঁর গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচিন্তার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর নিরুদ্দেশের কাহিনীকে অনেক গবেষক বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করেন। Bose Institute তাঁকে বাংলা science fiction-এর অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অর্থাৎ তাঁর কাছে বিজ্ঞান ছিল শুধু গবেষণাগারের বিষয় নয়। বিজ্ঞান ছিল মানুষের কৌতূহল, কল্পনা ও জ্ঞানচর্চার অংশ।
কেন তাঁকে আজও মনে রাখা জরুরি?
জগদীশচন্দ্র বসুর জীবনকে কয়েকটি আবিষ্কারের তালিকায় সীমাবদ্ধ করলে তাঁর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না।
তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত তিনটি।
প্রথমত, সীমিত সম্পদ সৃজনশীল গবেষণার অন্তরায় হতে পারে, কিন্তু অপরিহার্য বাধা নয়। ঔপনিবেশিক ভারতে আধুনিক গবেষণার পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও বসু নিজেই বহু যন্ত্র তৈরি করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞান প্রকৃতিগতভাবে আন্তঃবিষয়ক। পদার্থবিজ্ঞান থেকে উদ্ভিদ-শারীরবিদ্যায় তাঁর যাত্রা দেখায় যে একটি মৌলিক প্রশ্ন কখনো কখনো একাধিক বৈজ্ঞানিক শাখার সীমা অতিক্রম করে।
তৃতীয়ত, বিজ্ঞান কৌতূহল দিয়ে শুরু হয়। বেতার তরঙ্গ থেকে উদ্ভিদের বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত তাঁর গবেষণার পেছনে ছিল প্রকৃতির গভীরে লুকিয়ে থাকা নিয়ম আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষা।
একজন বাংলাদেশীর উত্তরাধিকার, একটি বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য
জগদীশচন্দ্র বসুর জন্ম হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন "বাংলাদেশ" নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল না। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের মানুষ। তাই তাঁকে আধুনিক রাজনৈতিক অর্থে "বাংলাদেশের নাগরিক বিজ্ঞানী" বলা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়।
কিন্তু তাঁর জন্মস্থান বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ। তাঁর পারিবারিক শিকড়ও বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জের রাঢ়িখাল অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। রয়্যাল সোসাইটির নথিও তাঁর জন্মস্থানকে Mymensingh, Bangladesh হিসেবে উল্লেখ করে।
সুতরাং তাঁকে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি বিজ্ঞানী বলা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত।
আর তাঁর উত্তরাধিকার কেবল বাঙালি বা দক্ষিণ এশীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাইক্রোওয়েভ গবেষণা, বেতার তরঙ্গের পরীক্ষণ, detector technology, বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নির্মাণ এবং plant electrophysiology, এসব ক্ষেত্রে তাঁর কাজ আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থায়ী স্থান পেয়েছে। Physics Today তাঁকে wireless transmission of microwaves এবং plant biophysics-এর পথিকৃৎ হিসেবে বর্ণনা করেছে।







