সাধারণ
সাইবার বুলিংয়ের মধ্যেও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যস্ত ডা. সিনথিয়া তাসমিন

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম তদারকি ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. সিনথিয়া তাসমিন। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট ও অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব পোস্টকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে তিনি শ্রীমঙ্গল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।
৩৩তম বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার সমন্বয় ও তদারকি করছেন। মাতৃস্বাস্থ্য,স্বাভাবিক প্রসব, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব এবং নারীদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে তাঁর দায়িত্ব পালন স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।
ডা. সিনথিয়া তাসমিন এমবিবিএস ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এমপিএইচ) ডিগ্রিধারী। শ্রীমঙ্গলে দায়িত্ব পালনের আগে তিনি কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ হাজার ৭২৬টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। একই সময়ে ১১৩টি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়।
হাসপাতাল সূত্র আরও জানায়, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের একজন গাইনি বিশেষজ্ঞের সহযোগিতায় সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সিজারিয়ান সেবা পুনরায় চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে সপ্তাহে এক দিন এ সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, সীমিত জনবল ও বিভিন্ন বাস্তব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। এসব কার্যক্রমের প্রশাসনিক তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন ডা. সিনথিয়া তাসমিন।
মাতৃস্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার শনাক্তকরণে স্ক্রিনিং কার্যক্রমেও কাজ করছে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী,২০২৬ সালে সিলেট বিভাগের জেলা পর্যায়ের স্ক্রিনিং কার্যক্রমে জনসংখ্যাভিত্তিক কর্মসূচির আওতায় ইলেকট্রনিক তথ্য সংরক্ষণ ও অনুসরণের ব্যবস্থাসহ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানটি স্বীকৃতি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নারীদের মধ্যে ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের আওতা বাড়ানো এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রচেষ্টা ও সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন ডা. সিনথিয়া।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডা. সিনথিয়া তাসমিনকে নিয়ে কয়েকটি পোস্ট প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। তাঁর অভিযোগ,ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে তাঁকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। এতে তাঁর সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত সুনাম ক্ষুন্ন হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এ ঘটনায় তিনি শ্রীমঙ্গল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তবে বিতর্কিত পোস্টগুলোর যথেষ্ট সত্যতা রয়েছে। উত্থাপিত অভিযোগের যথার্থতা এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে না এবং অপপ্রচারকারীরা এখনো অনবরত সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং কিছু ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে যেসব অভিযোগ ও প্রচার চালানো হচ্ছে,সেগুলো ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁর সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতেই এসব করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। আর এদের সাথে শ্রীমঙ্গলের চিকিৎসা সেবা খাতে সিন্ডিকেট মহলও জড়িত।
তিনি বলেন,“একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দেশের আইন ও চলমান পুলিশি তদন্তের প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।”
তিনি আরও বলেন,সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা,বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে হেয় করার চেষ্টা তাঁদের দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শ্রীমঙ্গলের মানুষের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী বলেন,নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং হয়রানিমুক্ত কর্মপরিবেশ বজায় রাখা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারীদের পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ সিডওতে (CEDAW) বাংলাদেশ পক্ষভুক্ত। কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মানদণ্ডও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।
ওই আইনজীবী বলেন,কোনো সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে উত্থাপিত অভিযোগ যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যকে তদন্ত ছাড়াই সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রচার,হুমকি,হয়রানি বা মানহানির প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের মধ্যেও শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা,স্বাভাবিক প্রসব, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার,নারীদের স্বাস্থ্যসেবা ও ক্যানসার স্ক্রিনিং কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্টদের মতে,উপজেলা পর্যায়ের একটি সরকারি হাসপাতালে সেবার মান বজায় রাখতে সীমিত জনবল ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়,যা ডা. সিনথিয়া তাসমিনের কঠোর দিকনির্দেশনায় সম্ভব হয়েছে।
ডা. সিনথিয়া তাসমিনকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্টগুলোর বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। অতিদ্রুত তদন্তের ফল পাওয়া গেলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন হবে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা,নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত হবে এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনসাধারণের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিকভাবে অব্যাহত থাকবে।







