লাইফস্টাইল
গান তাঁর পরিচয়, পড়াশোনাই প্রথম অগ্রাধিকার: হাবিপ্রবির স্বর্ণপদকজয়ী স্নেহা

জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক অর্জন, টেলিভিশনের সংগীতবিষয়ক রিয়েলিটি শোতে রানারআপ হওয়া, ফিজিক্স অলিম্পিয়াডের জাতীয় পর্বে অংশগ্রহণ—সাফল্যের খাতায় এমন অনেক অর্জন জমা হয়েছে গীতাঞ্জলি ঘোষ স্নেহার। তবে এত কিছুর পরও নিজের অগ্রাধিকারের প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট। তাঁর কাছে পড়াশোনাই প্রথম। সংগীত তাঁর ভালোবাসা, আর গানই তাঁর নিজস্ব পরিচয়ের একটি বড় অংশ।
দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) কৃষি অনুষদের ২০২৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী স্নেহা ছোটবেলা থেকেই সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একের পর এক অর্জন যুক্ত করেছেন নিজের ঝুলিতে। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা থেকে টেলিভিশনের পর্দা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর।
জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক
২০১৮ সালে শুদ্ধস্বরে জাতীয় সংগীত প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করে স্বর্ণপদক পান স্নেহা। পরের বছর শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় দেশাত্মবোধক সংগীতে জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হয়ে অর্জন করেন রৌপ্যপদক।
এরপর বিভিন্ন সংগীত প্রতিযোগিতায় নজরকাড়া সাফল্য পান তিনি। নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, হামদ-নাত, আধুনিক ও দেশাত্মবোধক গানসহ নানা ধারায় একাধিকবার প্রথম হয়েছেন স্নেহা। ২০১৯ সালে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে বিভাগীয় পর্যায়ে উচ্চাঙ্গসংগীতে দ্বিতীয় হন। একই বছর একাডেমি অব ফাইন আর্টস আয়োজিত সংগীত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০২০ সালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত প্রতিযোগিতায় বিভাগীয় পর্যায়ে দেশাত্মবোধক গানে প্রথম হন। পরের বছর গ্রিন ভয়েস আয়োজিত দেশাত্মবোধক সংগীত প্রতিযোগিতায়ও প্রথম স্থান অর্জন করেন।
টেলিভিশনের পর্দায় সাফল্য
মঞ্চের পাশাপাশি টেলিভিশনেও নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন স্নেহা। ২০২২ সালে আরটিভির সংগীতভিত্তিক রিয়েলিটি শো ‘সুফিয়ানা’য় দ্বিতীয় রানারআপ হন তিনি। এর আগে ২০২০ সালে এটিএন মিডিয়া কমিউনিকেশন আয়োজিত আট দেশের প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণে ‘আগামীর তারকা’ প্রতিযোগিতার ফাইনালিস্ট হয়েছিলেন।
এ ছাড়া আরটিভির ‘মিউজিক স্টেশন’ ও ‘আর-স্টুডিও’ এবং মাছরাঙা টেলিভিশনের ‘রাঙাসকাল’ অনুষ্ঠানেও গান গেয়েছেন তিনি। ছায়ানটে নজরুলসংগীত রেকর্ডিংসহ বিভিন্ন সংগীত রেকর্ডিংয়ে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
সংগীতের বাইরেও সাফল্য
শুধু সংগীত নয়, পড়াশোনার বাইরের অন্যান্য প্রতিযোগিতাতেও আগ্রহ রয়েছে স্নেহার। ২০২০ সালে ফিজিক্স অলিম্পিয়াডের আঞ্চলিক পর্বে বিজয়ী হয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ২০১৯ সালে ন্যাশনাল ইংলিশ অলিম্পিয়াডের আঞ্চলিক পর্বে উত্তীর্ণ হয়ে থিয়েটার রাউন্ডেও অংশ নেন।
মায়ের হাত ধরে সংগীতের পথে
২০০৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর জন্ম স্নেহার। সংগীতে তাঁর হাতেখড়ি মা নমিতা ঘোষের কাছে। সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক নমিতা ঘোষ রবীন্দ্র ভারতীতে পড়াশোনা করেছেন। মায়ের কাছ থেকেই সংগীতের প্রতি ভালোবাসা ও চর্চার প্রেরণা পেয়েছেন স্নেহা। তাঁর বাবা গৌতম কুমার ঘোষ একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন স্নেহা। সপ্তম শ্রেণিতে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতচর্চা। এরপর জেলা, উপজেলা, আঞ্চলিক ও বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অর্জন করেন একের পর এক সাফল্য।
বিশ্ববিদ্যালয়েও অব্যাহত সংগীতচর্চা
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরও সংগীত থেকে দূরে সরে যাননি স্নেহা। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন নিয়মিত। হাবিপ্রবির দ্বিতীয় সমাবর্তন উপলক্ষে কৃষি অনুষদের ‘কৃষি-কথন’, অনুষদের নববর্ষ উদ্যাপন এবং সেজুতি সাংস্কৃতিক ঐক্যের ‘প্রলয়-উল্লাস’ অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত শিক্ষাজীবনের মধ্যেও সংগীতচর্চা চালিয়ে যাওয়াকে নিজের ভালো লাগার জায়গা হিসেবে দেখেন স্নেহা। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভাবনায় পড়াশোনার অবস্থান সবার ওপরে।
‘গান আমার নিজস্ব পরিচয়, তবে পড়াশোনাই প্রথম’
সংগীতের প্রতি ভালোবাসা এবং পড়াশোনার প্রতি দায়বদ্ধতা—দুটির মধ্যে ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যেতে চান স্নেহা। নিজের সংগীতজীবনের পেছনে পরিবারের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “মা রবীন্দ্র ভারতীতে পড়াশোনা করে এখানে গানের স্কুল দিয়েছেন। মায়ের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা আর বাবাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছুটে চলা কিছুটা হলেও কাজে লাগাতে পেরেছি। সংগীতের প্রতি ভালোবাসা সব সময় থাকবে। তবে সংগীত দিয়ে জীবন চলবে না, এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পড়াশোনার প্রতি আমার আস্থা বেশি।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে স্নেহা বলেন, “পড়াশোনার পাশাপাশি সব সময় গান নিয়ে এগিয়ে চলতে চাই। গান আমার কাছে অন্য রকম সম্মান ও শ্রদ্ধার জায়গা, যা আমার নিজস্ব পরিচয়। সংগীত ছাড়া নিজেকে কখনো ভাবতে পারি না। তবে সব সময়ই আমার প্রথম অগ্রাধিকার পড়াশোনা। এ জন্য সবার আশীর্বাদ ও দোয়া চাই।”
মেয়ের সাফল্যে গর্বিত বাবা গৌতম কুমার ঘোষ। তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীত, আবৃত্তি ও নাচের প্রতি স্নেহার আগ্রহ ছিল। তার মায়েরও ইচ্ছা ছিল, মেয়ে নাচে-গানে ভালো করবে। আজ সেই ইচ্ছা অনেকাংশে পূরণ হয়েছে। তবে সংগীতকে পেশা হিসেবে নিয়ে কর্মজীবন গড়বে না, এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত ছিলাম।”
মা নমিতা ঘোষও মেয়ের নিষ্ঠা ও ধারাবাহিক সাফল্যে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। স্নেহার অর্জিত অসংখ্য সনদপত্র, ক্রেস্ট ও পুরস্কার পরিবারের কাছে আনন্দ ও গর্বের স্মারক।
সংগীতের প্রতি ভালোবাসা আর পড়াশোনার প্রতি দায়বদ্ধতা—দুইয়ের সমন্বয়েই নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চান গীতাঞ্জলি ঘোষ স্নেহা। সংগীতকে হৃদয়ে ধারণ করে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়াই তাঁর প্রত্যাশা। তাঁর কাছে গান কেবল প্রতিযোগিতায় জয় কিংবা পুরস্কার পাওয়ার বিষয় নয়; এটি নিজের পরিচয়ের অংশ। তবে সেই পরিচয়কে সঙ্গে নিয়েই পড়াশোনায় সাফল্য অর্জন করতে চান তিনি।







