সাহিত্য
শ্রীমঙ্গলে বইপড়া উৎসবের সমাপ্তি,ল্যাপটপ পেলেন ৮ শিক্ষার্থী

‘বই পড়ি,মন গড়ি’ স্লোগানে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে তিন মাসব্যাপী বইপড়া উৎসবের সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে শ্রীমঙ্গল জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উৎসবের ফলাফল ঘোষণা করা হয় এবং বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতায় আটটি ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অর্জনকারী আট শিক্ষার্থী পেয়েছেন একটি করে ল্যাপটপ।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুজ্জামান পাভেল। স্বাগত বক্তব্য দেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান।
অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী,অভিভাবক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ,সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধি ও সাধারণ পাঠকেরা উপস্থিত ছিলেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়,গত ২১ জুলাই শুরু হওয়া এ উৎসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা,জ্ঞানচর্চায় আগ্রহ বাড়ানো এবং সৃজনশীল ও মননশীল প্রজন্ম তৈরি করা। এ আয়োজনে উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ পাঠকদেরও অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।
উৎসবের কার্যক্রম তিনটি পর্বে পরিচালিত হয়। এ সময় অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিভিন্ন বই পড়ার ব্যবস্থা করা হয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত মূল্যায়ন পরীক্ষা। এতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকসহ ৭৬০ জন অংশ নেন বলে আয়োজক-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন,বই মানুষের প্রকৃত বন্ধু। বই পড়ার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান,চিন্তাশক্তি ও মননশীলতার বিকাশ ঘটে। শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কমিয়ে বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন,ল্যাপটপ বা অন্য কোনো পুরস্কার অর্জনের চেয়ে বই পড়ার মাধ্যমে জ্ঞান ও চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটানোই এ উৎসবের বড় সাফল্য। তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। তাদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
তিনি আরও বলেন,প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি তরুণদের বইয়ের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত বই পড়ার চর্চা শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি দেশ ও সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে।
প্রতিযোগিতায় আটটি ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অর্জন করে ল্যাপটপ পেয়েছেন ফাতেমা জাহান, রাজশ্রী হালদার,অদ্রিজা পাল,আসাদুজ্জামান শিহাব,উম্মে কুলসুম মীম,তাসনুভা সুহা,উম্মে নাফিসা মাইমুনাহ ও ফাতেমা সুলতানা।
এ ছাড়া প্রতিটি ক্যাটাগরিতে আরও নয়জন করে শিক্ষার্থীকে বিশেষ সনদ,ক্রেস্ট ও বই উপহার দেওয়া হয়।
ল্যাপটপ বিজয়ী দি বাডস রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজশ্রী হালদার বলেন,ল্যাপটপ পেয়ে তিনি খুব আনন্দিত। তবে বই পড়ার মাধ্যমে জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে পারাটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন।
রাজশ্রী জানায়,আগে মোবাইল ফোনে অনেক সময় ব্যয় হলেও এখন বই পড়ে নতুন নতুন বিষয় জানতে পারছে। উৎসবের নির্ধারিত বইগুলোর মধ্যে ‘জিবরাইলের ডানা’ ও ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ পড়ে তার চমৎকার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
উচ্চমাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে ল্যাপটপ বিজয়ী শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তাসনুভা সুহা বলেন,তিনটি পর্বে তিনটি ব্যতিক্রমধর্মী বই পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। বইগুলো পড়ে তাঁর ভালো লেগেছে। পাওয়া ল্যাপটপটি পড়াশোনা, অনলাইন ক্লাস ও অন্যান্য শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহার করবেন।
বইপড়া উৎসবের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণ। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক,প্রভাষক,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান,সরকারি কর্মকর্তা,ব্যাংকার,সাংবাদিক, ফার্মাসিস্ট,ইলেকট্রিশিয়ান,গৃহিণী ও সাধারণ পাঠকেরাও এ উদ্যোগে যুক্ত হন।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক আহম্মদ আলী রুবেল,হাফছা খাতুন,নূর মোহাম্মদ (মুশফিক),রুমা আক্তার,গৌরী রানী শীল,তামভীর হোসেন ফরহাদ,কাজী শওকত হোসেন,মিঠু চন্দ্র পাল,মিনারুল ইসলাম,কাকলী পুরকায়স্থ,তমা দাশ,বাদশাহ ফয়সাল,নিশান চৌধুরী,সুমন,শুভ রায়,হাবিবুর রহমান ও জহিরুল ইসলাম মিঠু।
এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা মো. নাজমুল আলম, উজ্জ্বল সূত্রধর ও রাজু বিশ্বাস,ব্যাংকার শাহীন সিরাজী,ফার্মাসিস্ট কংকন পুরকায়স্থ, ইলেকট্রিশিয়ান সোহানুর রহমান রনি,শিক্ষার্থী উর্মি আক্তার ও সমীরণ সরকার,গৃহিণী রত্না চক্রবর্তী ও ফারহানা আফরোজ,সাংবাদিক সত্যজিৎ দাস,প্রথম আলোর শিমুল তরফদার এবং দ্বারিকা পাল মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ জলি পালসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। উন্মুক্ত বিভাগে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে একটি করে বই ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়।
উৎসবের অন্যতম আয়োজক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দেবাশীষ দাশ শিক্ষার্থীদের লেখা বই পর্যালোচনা বা বুক রিভিউয়ের প্রশংসা করেন। তিনি জানান, চূড়ান্ত পর্বে শিক্ষার্থীরা যে মানের বুক রিভিউ লিখেছে,তা তাদের চিন্তাশক্তি,সৃজনশীলতা ও কল্পনার পরিচয় তুলে ধরেছে।
তাঁর মতে,একই বই নিয়ে লেখা হলেও শিক্ষার্থীদের পর্যালোচনায় নিজস্ব চিন্তা ও উপলব্ধির স্বতন্ত্র প্রকাশ দেখা গেছে। শ্রেণিভিত্তিক সেরা বুক রিভিউগুলো নিয়ে পৃথক দেয়ালিকা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে,যাতে শিক্ষার্থী ও বইপ্রেমীরা সেগুলো পড়ার সুযোগ পান।
এ আয়োজন সফল করতে সহযোগিতা করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান,ফোকাল পারসন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে তাদের অর্জনের কৃতিত্ব তাদেরই বলে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে ইউএনও মো. জিয়াউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা প্রকাশ করেন,এ আয়োজন শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকদের মধ্যে নিয়মিত বই পড়ার আগ্রহ বাড়াবে। পাশাপাশি প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের সঙ্গে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে শ্রীমঙ্গলে জ্ঞানভিত্তিক, সৃজনশীল ও মানবিক প্রজন্ম তৈরিতে তা সহায়ক হবে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা,উৎসবের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা পাঠাভ্যাস ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে এবং শিক্ষার্থীসহ সব বয়সী মানুষের মধ্যে জ্ঞানচর্চার আগ্রহ ছড়িয়ে পড়বে।







