অর্থনীতি

৫ বছরের রেকর্ড ভাঙল ডলার লেনদেন: একদিনেই ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি কেনাবেচা

Desk Reportকন্ট্রিবিউটর৯ অক্টোবর ২০২৬ · ৩ মিনিটের পড়াRead in English

দেশের আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলার লেনদেনে উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২০ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি লেনদেন হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের মতে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এক দিনে আন্তঃব্যাংক বাজারে এটিই সর্বোচ্চ ডলার লেনদেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এর আগের দিন ৭ অক্টোবর আন্তঃব্যাংক বাজারে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার লেনদেন হয়েছিল। আর ৬ অক্টোবর লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। ফলে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এ বাজারে ডলার কেনাবেচার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সরবরাহ বেশি, তুলনামূলক কম চাহিদা

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বর্তমানে ডলারের সরবরাহ তুলনামূলক বেশি থাকলেও সেই অনুপাতে চাহিদা বাড়েনি। প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ অব্যাহত থাকায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকে উদ্বৃত্ত ডলার জমা হয়েছে।

অন্যদিকে আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু ব্যাংকের ডলারের চাহিদা রয়েছে। ফলে উদ্বৃত্ত ডলার থাকা ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক বাজারে বিক্রি করছে এবং প্রয়োজন থাকা ব্যাংকগুলো তা কিনছে।

ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় নেট ওপেন পজিশন (এনওপি) একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। এটি মূলত ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রাসংক্রান্ত সম্পদ ও দায়ের নিট অবস্থান নির্দেশ করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার মধ্যে এই অবস্থান বজায় রাখতে হয়।

কোনো ব্যাংকের এনওপি নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি পৌঁছালে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে।

সরকারি পেমেন্টের প্রস্তুতিতেও বাড়ছে কেনাবেচা

ব্যাংক খাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসে সরকারের বিভিন্ন বৈদেশিক পরিশোধের সময়সূচি রয়েছে। এসব পরিশোধের দায়িত্বে থাকা ব্যাংকগুলো আগাম ডলার সংগ্রহ করছে।

একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরের তুলনায় পরবর্তী সময়ে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেও কয়েকটি ব্যাংক ডলার মজুত বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতের বৈদেশিক পরিশোধ নির্বিঘ্ন রাখতে তারা আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় ডলার কিনছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিয়মিত ডলার কেনা বন্ধ রাখায় উদ্বৃত্ত বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির জন্য ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক বাজারের ওপর বেশি নির্ভর করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সক্রিয় হচ্ছে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজার

আন্তঃব্যাংক বাজার এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থা, যেখানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা, স্বল্পমেয়াদি তহবিল কিংবা অন্যান্য আর্থিক উপকরণ লেনদেন করে। সাধারণ গ্রাহক বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি এই বাজারে অংশ নিতে পারে না।

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে পর্যাপ্ত লেনদেন ও কার্যকর মূল্য নির্ধারণের সুযোগ সীমিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক ডলার কেনাবেচা বাড়ায় বাজারটি তুলনামূলক সক্রিয় হয়ে উঠছে।

সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স ২৭৬ কোটি ডলার

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে ২৭৬ কোটি মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা আগের ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।

তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জুলাই ও আগস্টে দেশে মোট ৫৮৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।

প্রবাসী আয়ের এই প্রবৃদ্ধির প্রভাবে দেশের চলতি হিসাবের উদ্বৃত্তও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট সময়ে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্ত ছিল ১৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত প্রায় তিন গুণ হয়েছে।

ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের বিনিময় হার নিম্নমুখী হতে শুরু করলে প্রায় তিন মাসের বিরতির পর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে ৫ কোটি মার্কিন ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক। সাধারণত বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে গেলে এবং বিনিময় হারে নিম্নমুখী চাপ তৈরি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনে বাজার থেকে অতিরিক্ত সরবরাহের একটি অংশ শোষণ করতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কার্যকর আন্তঃব্যাংক বাজার বৈদেশিক মুদ্রার সুষম বণ্টন, বিনিময় হার নির্ধারণ এবং ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সাম্প্রতিক লেনদেন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতা এবং বাজারভিত্তিক লেনদেন আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ বিষয়ে আরও খবর